বাড়ির অদূরেই ছিলো শংকরমঠ। শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, স্বদেশী আন্দোলনেও এই স্থাপনার ছিলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সেসময় ধর্মীয় কার্যক্রমের আড়ালে সত্যাগ্রহের কর্মীরা মোটা খাদির ধুতিপাঞ্জাবি চাদর জড়িয়ে এখানে জড়ো হতেন, বৃটিশ খেদানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা করতেন ছদ্মবেশের আড়ালে! মঠের তিনটি চূঁড়োর মাঝখানেরটা বড় – যা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ত্রিশুল বাগিয়ে আকাশের দিকে তাক করা। তিনটি প্রকোষ্ঠের মাঝখানে শিবলিঙ্গ আর বাঁ দিকেরটায় ছিলেন শ্বেতপাথরের প্রমাণসাইজের নিরেট বুদ্ধদেব। ন্যাড়া মাথা, পদ্মাসনে শান্ত-স্থির আর হাতের ভঙ্গীতে বরাভয়। দেখলে ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা জাগতো মনে! বহুকৌণিক অথচ বৃত্তাকার সেই কামরার দরজা সাধারণ সময়ে বন্ধই থাকতো। আমরা চারদিকের বাহারি সরু লম্বা জানালা দিয়ে দেখতাম ভেতরে বসে একমনে ধ্যান করছেন অমিতাভ। বিশেষভাবে নজরে পড়তো তাঁর দীর্ঘ কর্ণযুগল যা প্রায় কাঁধ ছুঁইছুঁই! একটা গোটা পাথরের চাঁই কেটে তাঁকে বানানো হয়েছে। মসৃণ, নিখুঁত ওরকম বিগ্রহ বরিশালে তো নয়ই, সারা দেশে আর দ্বিতীয়টি আছে কিনা সন্দেহ।
সে সময় মনে হতো তিনিও হিন্দুদেরই কোনো দেবতাবিশেষ। বড় হয়ে বুঝেছি তাঁর অনুসারীগণ আলাদা ধর্মীয় বিশ্বাস পালন করেন। কলেজে দর্শন পড়তে গিয়ে তাঁর আর্যসত্য মুখস্থ করতে হয়েছে। হঠাৎ একদিন শুনলাম, কে বা কাহারা রাতের আঁধারে অতো ভারী বিশাল সেই বুদ্ধমূর্তি হাওয়া করে দিয়েছে। পুলিশ কেস হয়েছিলো মনে হয়। লোকে বলাবলি করতো প্রত্নপাচারকারীরা সেটা হয়তো দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে!
তো এতদিন বাদে আমার করোটিতে জমে থাকা ধ্যানীবুদ্ধ মৃন্ময় অবয়বে আবির্ভূত হলেন! এটি একেবারেই শংকরমঠের সেই বুদ্ধের অনুরূপ নয়। আমি যেভাবে বুদ্ধকে দেখতে চেয়েছি, সেভাবেই নির্মাণ করেছি। ইম্প্রোভাইজ করার চেষ্টা করেছি তাঁর অভিব্যক্তিকে। এই স্টাডি চলমান। আরও কয়েকটি মাধ্যমে আমি তাঁর মুখাবয়ব নির্মাণের চেষ্টা করবো ভবিষ্যতে।
বলে রাখা ভালো, এহেন মৃৎকর্ম আমার জীবনে এই প্রথম।
জুলাই ২০২১